যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতা করছে পাকিস্তান। আর এই প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।
ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির নিজেকে পাকিস্তানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় দেশই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাকে পছন্দ করছে। যুদ্ধরত দেশ দুটি তাদের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হবে কি না তা বিবেচনা করছে, যা শেষ হতে চলেছে আগামী সপ্তাহে।
বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ শেষ করতে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি হলে তা স্বাক্ষরের জন্য তিনি পাকিস্তান সফরে যেতে পারেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ফিল্ড মার্শাল চমৎকার কাজ করছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও অসাধারণ। তাই আমি হয়তো যাব। তারা আমাকে চায়।’
ইরানের গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আসিম মুনির তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ শান্তি আলোচনায় গালিবাফ এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে স্বাগত জানাতে আসিম মুনির উপস্থিত ছিলেন এবং আলোচনা সহজতর করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়া শেষ হলেও উভয় পক্ষই এখন শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে আলোচনার জন্য দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি আরো বাড়ানোর কথা বিবেচনা করছে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান উভয় পক্ষের কাছ থেকেই আশাতীত ব্যক্তিগত আস্থা অর্জন করেছেন, তা স্পষ্ট। ট্রাম্প মুনিরের প্রশংসা করে তাকে তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে অভিহিত করেছেন। বুধবার তেহরানে সামরিক পোশাকে অবতরণের সময় আরাগচি মুনিরকে আন্তরিকভাবে আলিঙ্গন করেন এবং বলেন যে ইরান তাকে স্বাগত জানাতে পেরে উচ্ছ্বসিত। পাশাপাশি আলোচনায় মধ্যস্থতা করার জন্য দেশটির প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে পেরেছে পাকিস্তান। সেইসঙ্গে সৌদি আরব ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে সক্ষম হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে গড়ে ওঠা ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেশটির মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছে।
করাচির ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফারহান সিদ্দিকী বলেন, ‘আসিম মুনির যখন বিমান থেকে নামলেন, তখন তার সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যকার উষ্ণ সম্পর্ক স্পষ্ট প্রতিয়মান হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কেও একটি শক্তিশালী পুনর্বিন্যাস ঘটেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আসিম মুনিরের কথা শোনেন — তিনি তার কথা বিবেচনা করেন। আমি মনে করি এটাই আমাদের এবং মুনিরকে একটি কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।’
ভারত সংঘাত:
গত বছর ভারতের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সংঘাতের পর পাকিস্তানের বেসামরিক নেতার চেয়েও তিনি বেশি পরিচিত হয়ে ওঠেন। পারমাণবিক শক্তিধর এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে তিনি যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করেছেন বলে ট্রাম্পের দাবি নয়াদিল্লি প্রত্যাখ্যান করলেও ইসলামাবাদ তা গ্রহণ করে। গত বছরের জুন মাসে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে এক ব্যক্তিগত মধ্যাহ্নভোজে মুনিরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যা সেই সময়ে একটি আলোচিত ঘটনা ছিল। এরপর থেকে তিনি বেশ কয়েকবার ওয়াশিংটন সফর করেছেন এবং সেপ্টেম্বরে শেহবাজ শরিফের সঙ্গে ওভাল অফিসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গেও ঐতিহাসিকভাবে ভালো সম্পর্ক রয়েছে পাকিস্তানের।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সম্প্রসারণ আসিম মুনিরের অবস্থানকে আরো সুসংহত করেছে। পার্লামেন্ট তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ, যার মধ্যে ভারতের বিরুদ্ধে সংঘাতে তার ভূমিকাও অন্তর্ভুক্ত, তাকে আজীবন বিচার থেকে দায়মুক্তি দিয়েছে।
ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, সবুজে ঘেরা পাকিস্তানি রাজধানী আবারো আলোচনার আয়োজন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত সপ্তাহান্তে প্রথম দফা আলোচনাকে ঘিরে যে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা এখনো পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়নি।
ওয়াশিংটনের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ডেপুটি ডিরেক্টর অ্যাডাম ওয়াইনস্টাইন বলেন, ‘আসিম মুনির প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে গভীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন এবং পাকিস্তানের স্বার্থে সম্পর্কটি কীভাবে পরিচালনা করতে হয় তা তিনি বোঝেন বলেই মনে হচ্ছে।’
সূত্র: এনডিটিভি

